
লেখকঃ আবু ইয়াদ
শয়তানের প্রকৃতি
শয়তান কে? শয়তান বলে কি বাস্তবে কিছু আছে? নাকি এটা একটা নিছক কল্পনা? নাকি সমাজে প্রচলিত কোন গাল-গল্প? মূলতঃ এটা আমাদের আকীদার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জ্বিনকে বিশ্বাস করা অদৃশ্যে বিশ্বাসের একটি অংশ। এবং একজন মুসলিমের ঈমান পূর্ণতা পায় না যতক্ষণ পর্যন্ত না সে এই অদৃশ্য বিষয়ে বিশ্বাস করে। যদিও বা এই অদৃশ্য বিষয় তার বুদ্ধিমত্তা বা চিন্তার সাথে খাপ না খায়। জ্বিনের অস্তিত্ব কোরআন শরীফ ও হাদীস দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত। আল্লাহ্ বলেন :“আমি জ্বিন ও মানুষকে কেবলমাত্র আমার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি” [আয্ যারিয়াত : ৫৬]
“বলুন : আমার প্রতি ওহী নাযিল করা হয়েছে যে, জ্বিনদের একটি দল কোরআন শ্রবণ করেছে অতঃপর তারা বলেছে আমরা বিস্ময়কর কোরআন শ্রবণ করেছি।” [আল-জিন : ১]
“অনেক মানুষ অনেক জ্বিনের আশ্রয় নিত, ফলে তারা জ্বিনদের আত্মম্ভরিতা বাড়িয়ে দিত।” [আল-জ্বিন : ৬]
মহানবী (সঃ) বলেন: “তিন ধরনের জ্বিন রয়েছে : একদল, যারা সর্বদা আকাশে উড়ে বেড়ায়, আরেকদল যারা সাপ ও কুকুরের আকার ধারণ করে থাকে এবং তৃতীয়দল পৃথিবীবাসী, যারা কোন এক স্থানে বাস করে বা ঘুরে বেড়ায়।” [বায়হাকী ও তাবারানী]
শয়তান সম্পর্কে আহল-আল-সুন্নাহ এর বিশ্বাস:
শয়তান হলো জ্বিন। আল্লাহ বলেন :আর জ্বিনদের সৃষ্টি করা হয়েছে মানবজাতির পূর্বেই এক ধোঁয়াহীন আগুন হতে, আল্লাহ বলেন :“আর আদমকে সেজদা করার জন্য সকল ফেরেশতাকে বলা হলো। সকলেই সেজদা করল। একমাত্র ইবলিস ব্যতীত। সে ছিল জ্বিনদের অন্তর্ভূক্ত। সে আল্লাহ্র অবাধ্য হলো…” [সূরা আল কাহফ : ৫০]
তাই মানবজাতির পূর্বেই জ্বিনের অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিল এবং তাদের একমাত্র দায়িত্ব হলো আল্লাহ্র দাসত্ব করা। মানুষের মতই জ্বিনদের চিন্তার স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা আছে। এবং তাদেরকে কৃতকর্মের জন্য আল্লাহ্র কাছে জবাবদিহি করতে হবে। আদম (আঃ) সৃষ্টির পূর্বে জ্বিনদের আবাসস্থল ও জীবন প্রণালী কেমন ছিল সে সম্পর্কে আমরা বিস্তারিত জানি না। যেহেতু আল্লাহ্ এ সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে কোরআনে কিছু বলেননি তাই এটা আমাদের নিকট তেমন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নয়।“এবং জ্বিনকে এর পূর্বেই সৃষ্টি করেছি গনগনে শিখা থেকে।” [হিজর : ২৭]
আদম (আঃ) এর সৃষ্টি:
জ্বিনের পরই আদম (আঃ) কে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ্র সকল সৃষ্টির মধ্যে আদম (আঃ) হলেন সর্বশেষ সৃষ্টি। ইবনুল কায়্যিম তাঁর ‘আল-ফাওয়াইদ’ গ্রন্থে আদম (আঃ) কে সর্বশেষে সৃষ্টির করার পেছনে দশটি কারণ দেখিয়েছেন। তার মধ্যে কয়েকটি হচ্ছে:- আদম (আঃ) ও তাঁর সন্তান-সন্ততি এবং বংশধরদের জন্য উপযুক্ত আবাসস্থল থাকতে হবে।
- মানুষের জন্যই বাকী সকল কিছু সৃষ্টি করা হয়েছে।
- একজন দক্ষ কারিগর তার সৃষ্ট কর্মের পরিসমাপ্তি তেমন নিখুঁতভাবেই করেন, যেমন ভাবে তিনি এর সূচনা করেছিলেন।
- আল্লাহ্ তার শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ (কোরান), শ্রেষ্ঠ পয়গম্বর (হযরত মুহাম্মদ সঃ) শ্রেষ্ঠ জাতি (মহানবীর (সঃ) উম্মত) সর্বশেষেই পাঠিয়েছেন। এমনকি ইহকালের চেয়ে পরকালই শ্রেয়তর। অনুরূপে আল্লাহ তার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিকে সর্বশেষে তৈরি করেছেন।
সকল জ্বিন ও ফেরেশতা আদম (আঃ)কে সেজদা করল একমাত্র ইবলিস ব্যতীত:
আদম (আঃ)কে সৃষ্টির পর আল্লাহ্ সকল ফেরেশতা ও জ্বিনকে আদম (আঃ)কে সিজদা করতে বললেন। এখানে লক্ষণীয় যে, এর দ্বারা আদম (আঃ) এর ইবাদত করতে বলা হয়নি বরং এর দ্বারা আল্লাহ্র আনুগত্য করতে বলা হয়েছে। কারণ সেজদা করবার নির্দেশ স্বয়ং আল্লাহ্ দিয়েছেন। একমাত্র ইবলিস ব্যতীত সকলেই নির্দেশ পালন করল। এই ঘটনা কোরআন শরীফে ৭ বার উল্লিখিত হয়েছে যেমন :অর্থাৎ ইবলিস ঔদ্ধত্য প্রকাশ করল যে সে আদম (আঃ) অপেক্ষা শ্রেয়তর। এমনকি ইবলিস আল্লাহ্র ওপর দোষারোপ করে বলল “যেহেতু আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন”। তার ভাগ্য নির্দিষ্ট হয়ে গেছে জেনে সে মানবজাতিকে বিপথে পরিচালনা করার অনুমতি আল্লাহ্র কাছ থেকে পেল। সে এটা স্পষ্ট ঘোষণা করল যে সে প্রতিটি ক্ষেত্রে মানবজাতিকে বিপথে পরিচালিত করবে। আর এই বিষয়টিকেই আমরা আমাদের পরবর্তী আলোচনায় বিশদভাবে ব্যাখ্যা করব।“আর আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, এরপর আকার-অবয়ব তৈরি করেছি। অতঃপর আমি ফেরেশতাদেরকে বলেছি আদমকে সেজদা কর। তখন সবাই সেজদা করেছে : কিন্তু ইবলিস ব্যতীত। সে সেজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। আল্লাহ্ বললেন: স্বয়ং আমি যখন নির্দেশ দিয়েছি তখন কিসে তোকে সেজদা করতে বারণ করল? সে বলল: আমি তার চাইতে শ্রেষ্ঠ। আপনি আমাকে আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছেন আর তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি দ্বারা। (আল্লাহ) বললেন: এখান থেকে তুই যা। এখানে তোর অহংকার করার কোন অধিকার নাই। অতএব তুই বের হয়ে যা। তুই হীনতমদের অন্তর্ভূক্ত। সে বলল: আমাকে কেয়ামত দিবস পর্যন্ত অবকাশ দিন। আল্লাহ্ বললেন: তোকে সময় দেয়া হলো। সে বলল: যেহেতু আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, আমিও অবশ্যই তাদের জন্য আপনার সরল পথে বসে থাকবো। এরপর তাদের কাছে আসব তাদের সামনের দিক হতে, পিছনের দিক থেকে, ডান ও বাম দিক হতে। আর আপনি তাদের অধিকাংশকেই কৃতজ্ঞ পাবেন না।” [আরাফ : ১১-১৭]
জান্নাত হতে আদম (আঃ), হাওয়া (আঃ) ও ইবলিস বহিষ্কৃত হলো ও পৃথিবীতে তাদের আগমন ঘটল:
জান্নাতে আদম ও হাওয়ার (আঃ) কাছে ইবলিস এসে নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খাবার জন্য প্ররোচিত করল এবং তাঁরা এই ফাঁদে পা দিলেন। আল্লাহ্ তখন তাদের উভয়কেই (আদম, হাওয়া) পৃথিবীতে প্রেরণ করলেন।এরপর আল্লাহ্ ঘোষণা করলেন যে, আদম (আঃ) ও তার বংশধরদের একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পৃথিবীতে থাকতে হবে। তাদের শত্রু শয়তান ও তার সাথীরাও পৃথিবীতে অবস্থান করবে। শয়তান মানবজাতিকে আল্লাহ্র স্মরণ থেকে বিরত রেখে পাপ, মিথ্যা, শিরক ও অন্যান্য কাজ, দ্বীনকে না জানা, সঠিকভাবে পালন না করা ইত্যাদিতে লিপ্ত রাখবে।“তোমরা উভয়েই এখান থেকে এক সঙ্গে নেমে যাও। তোমরা একে অপরের (আদম ও ইবলিস) শত্রু। তারপর যদি আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে হেদায়েত আসে, তখন যে আমার বর্ণিত পথ অনুসরণ করবে, সে পথভ্রষ্ট হবে না এবং কষ্টে পতিত হবে না। এবং যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবন সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে কেয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব। সে বলবে হে পালনকর্তা আমাকে কেন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করলেন? আমি তো চক্ষুষ্মান ছিলাম। আল্লাহ্ বলবেন এমনিভাবে তোমার কাছে আয়াতসমূহ এসেছিল। অতঃপর তুমি সেগুলো ভুলে গিয়েছিলে। তেমনিভাবে আজ তোমাকে ভুলে যাব।” [ত্বোয়াহা : ১২৩ : ১২৬]
শয়তানের উদ্দেশ্য:
শয়তান হলো মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। আল্লাহ্ বলেন:আল্লাহ্র এটা অশেষ দয়া যে তিনি মানুষকে শয়তানের উদ্দেশ্য, কর্মপদ্ধতি ও এর থেকে পরিত্রাণের উপায় বাতলে দিয়েছেন। শয়তানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন:“হে বনী আদম। আমি কি তোমাদের বলে রাখিনি যে, শয়তানের ইবাদত করো না। সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।” [ইয়াসীন : ৬০]
অর্থাৎ আল্লাহকে অবিশ্বাস, শিরক ও বিভিন্ন পাপ কাজের মাধ্যমে শয়তান মানুষকে জাহান্নামের আগুনের দিকে ঠেলে দেয়।“শয়তান তোমাদের শত্রু। অতএব তাকে শত্রুরূপেই গ্রহণ কর। সে তার অনুসারীদের আহ্বান করে যেন তারা জাহান্নামী হয়।” [ফাতির : ৬]
শয়তানের কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:
আমরা পরবর্তী পোষ্টে শয়তানের কার্যসিদ্ধির বিভিন্ন উপায় সম্পর্কে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।“তারা শয়তানের মত, যে মানুষকে কাফের হতে বলে। অতঃপর যখন সে কাফের হয় তখন শয়তান বলে: তোমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নাই। আমি বিশ্বপালনকর্তা আল্লাহ্ তা’আলাকে ভয় করি।” [হাশর : ১৬]





